Logo

জাতিসংঘে মিয়ানমারের মিথ্যাচার, কড়া প্রতিবাদ বাংলাদেশের

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৫তম অধিবেশনে বাংলাদেশ সম্পর্কে মিথ্যাচার করেছে মিয়ানমার। বাংলাদেশ ওই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে কড়া জবাব দিয়েছে। ঢাকা বলেছে, আবারও আমরা মিয়ানমারের নির্জলা মিথ্যাচার আর বানোয়াট বক্তব্য প্রত্যক্ষ করলাম। জাতিসংঘে জবাব দেয়ার অধিকারের বিধানের আওতায় মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর দফতরের মন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনুবিভাগের মহাপরিচালক সামিয়া আনজুম বলেছেন, রাখাইন রাজ্যের ঘটনা এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মিয়ানমারের বক্তব্য শুধু সাজানোই নয়; বরং পুরোপুরি বিভ্রান্তিকর। বাংলাদেশ এই ভিত্তিহীন অভিযোগ, মিথ্যাচার এবং বিকৃত তথ্যকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছে।

তিনি বলেন, মিয়ানমারের সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেয়ার অভিযোগ বাংলাদেশ জোর দিয়ে প্রত্যাখ্যান করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সন্ত্রাস, সন্ত্রাসে অর্থায়ন এবং অন্য যে কোনো ধরনের সন্ত্রাসবাদের প্রতি জিরো টলারেন্স নীতি মেনে চলে। আমরা সন্ত্রাসীদের আমাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দিই না। মানবাধিকার সুরক্ষা করে সব ধরনের সন্ত্রাস মোকাবেলা করার আমাদের রেকর্ড সব মহলে প্রশংসিত।

বাংলাদেশের প্রতিনিধি সামিয়া আনজুম আরও বলেন, মিয়ানমারকে আয়নায় নিজের চেহারা দেখা উচিত। মিয়ানমারে জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর অমানবিক আচরণের রেকর্ড নতুন নয়। এটা তাদের রাষ্ট্রের নীতি। তারা নিজেদের জনগণকে বের করে দিতে দমন-পীড়ন চালায়। এতে সেখানে বিদ্রোহী গোষ্ঠী উদ্ভবে উৎসাহিত হচ্ছে। এতে দেশটি সব ধরনের অপরাধের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সব সময় অর্থবহ নিরাপত্তা সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে মিয়ানমার কোনো আগ্রহ না দেখিয়ে ব্লেম গেমে যুক্ত হয়েছে। আমি যখন এখানে বক্তৃতা করছি; তখন রাখাইন রাজ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলছে। বিশ্বসম্প্রদায় যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও মিয়ানমার তা উপেক্ষা করে চলেছে। যুদ্ধবিরতির আহ্বানে যেসব দেশ যুক্ত হয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম প্রথম দেশ।

প্রত্যাবাসন ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রতিনিধি বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যু কোনো দ্বিপক্ষীয় ইস্যু নয়। এটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি হয়েছে মিয়ানমারে এবং তার সমাধানও তাদেরই করতে হবে। বাংলাদেশ প্রতিবেশী হওয়ায় ভিকটিম হয়েছে। দশ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন।

তিনি বলেন, আমরা সংলাপের মাধ্যমে এই সংকট নিরসনের জন্য বারবার আহ্বান জানাচ্ছি। বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তিতে উপনীত হয়েছি। কিন্তু দৃশ্যত মিয়ানমার সেই চুক্তির বাস্তবায়নে কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তাদের গণহত্যাকে যৌক্তিক হিসেবে প্রমাণ করতে ঘটনা বিকৃত করছে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের মন্ত্রীর ভিত্তিহীন অভিযোগের উদ্দেশ্য হল- মিয়ানমারের ওপর বর্তানো জোরপূর্বক বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে ফিরিয়ে নেয়ার দায়িত্বকে পরিহার করা। পরিবেশ উপযুক্ত নয় বলেই একজন রোহিঙ্গাও স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা তা প্রত্যক্ষ করছেন। আমরা রাখাইন রাজ্যকে আন্তর্জাতিক সংস্থা, জাতিসংঘ, গণমাধ্যম এবং যেসব দেশ মাঠের অবস্থা পর্যবেক্ষণে আগ্রহী তাদের জন্য খুলে দেয়ার আহ্বান জানাই।

তিনি আরও বলেন, এই ফোরামে এটা কারও অজানা নয় যে, ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের কী কারণে জোরপূর্বক বিতাড়িত করা হয়েছে, সে ব্যাপারে বিস্তারিত শুনানি হয়েছে। শুনানিকালে মিয়ানমারের নিষ্ঠুরতাকে খাটো করে দেখানোর প্রচেষ্টা বিশ্বের সবাই দেখেছে। বিশ্ব হতাশার সঙ্গে দেখেছে যে, মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর এসব মানুষকে রোহিঙ্গা হিসেবে উল্লেখ করতে বিরত রয়েছে।

তিনি বলেন, আজ বাংলাদেশে ১১ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছেন। মিয়ানমারের এসব মানুষ ২০১৭ সালের আগস্টে অভিযানের নামে নিধনযজ্ঞের শিকার হয়েছেন। কী নিষ্ঠুর বর্বরতা চালানো হয়েছে তা গোটা বিশ্ব উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করেছে। হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘরে আগুন দেয়া হয়েছে, যার শিকার বিপুল সংখ্যক নারী ও শিশু।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ কী করেছে ? আমরা সীমান্ত খুলে দিয়ে মানুষের জীবন রক্ষা করেছি। আমরা সেটা করেছি একটা বিশ্বাসের কারণে। সুপ্রতিবেশীর মতো তাদের ফিরে যাওয়ার লক্ষ্যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছি। এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও ফিরে যেতে ইচ্ছা পোষণ করেননি। ২০১৮ সালের নভেম্বর এবং ২০১৯ সালের আগস্টে দু’দফায় আমরা প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য সহায়তা করতে প্রস্তুত ছিলাম; কিন্তু দুর্ভাগ্য-একজন রোহিঙ্গাও মানতে পারেননি যে, তাদের উদ্বেগের নিরসন হয়েছে-যাতে আর কোনো নির্যাতন চালানো হবে না।

বাংলাদেশের প্রতিনিধি আরও বলেন, মিয়ানমারের মন্ত্রী দাবি করেছেন যে, ৩৫০ জন রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরে গেছেন। তিন বছরে ১১ লাখের মধ্যে ৩৫০ জন? আমরা যদি মিয়ানমারের মন্ত্রীর দাবি মেনেও নিই; প্রশ্ন হল- ওই ৩৫০ জন কারা? তারা কোথায় আছেন? ১১ লাখ লোকের মধ্যে ৩৫০ জন ফিরে যাওয়া কি রাখাইন রাজ্যের অবস্থার উন্নতির প্রমাণ বহন করে? এটা স্পষ্ট যে, ক্যাম্পে থাকা একজন রোহিঙ্গাও ফিরে যেতে আগ্রহী নন। কেন? কারণ, তারা মিয়ানমারকে বিশ্বাস করে না। তারা তাদের জীবন নিয়ে শঙ্কিত। তারা জানে না, তাদের জন্য মিয়ানমারে কী অপেক্ষা করছে। অব্যাহতভাবে আমরা রিপোর্ট পাচ্ছি যে, সেখানে রোহিঙ্গাদের আলাদা করা হচ্ছে, বৈষম্য চলছে, ক্লিয়ারেন্স অভিযান চলছে, বাসিন্দাদের সরিয়ে গ্রামের পর গ্রাম খালি করা হচ্ছে।

কোথায় তারা ফিরে যাবেন?

তিনি বলেন, আমরা মিয়ানমারের প্রতি মিথ্যাচার ও প্রপাগান্ডার নীতি পরিহারের আহ্বান জানাই। আপনারা নিজেদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়ার আন্তরিক সদিচ্ছা দেখান। রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরের নিরাপত্তা দিন। মিয়ানমারকে এই নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, তারা ফিরে গেলে তাদের আবার হত্যা করা হবে না। পুনরায় তারা ধর্ষিত হবে না। নির্যাতনের শিকার হবে না। মিয়ানমারের উচিত এ ব্যাপারে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যাতে তাদের নাগরিকরা স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেন। মিয়ানমারের বোঝা বারবার বহন করা বাংলাদেশের দায়িত্ব নয়। আমরা মিয়ানমারকে মিথ্যাচার বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলব, যাতে তারা বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবিকার নিশ্চয়তা পায়। এগুলো নিশ্চিত করার জন্য মিয়ানমারকে সহায়তা করতে আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি অনুরোধ জানাই। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ প্রস্তুত। মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সম্মান পেতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সত্যিকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Developed By Banglawebs