Logo

রজব মাসের তাৎপর্য

মাওলানা ইউনূছ আরমান:::                        কদিন হল রজব মাসের আগমন ঘটেছে৷ রজব মাস হিজরী মাসগুলোর মধ্যে একটি বিশেষ ও মহিমান্বিত মাসের নাম। এ মাস আসে রমযানের আগমনী বার্তা নিয়ে। করোনা মহামারীর এই দুর্যোগ সময়ে রজবের মত মহিমান্বিত মাসগুলো আমাদের জন্য রহমত স্বরূপ৷ ইসলাম আগমনের পর বছরে ১২ মাসের মধ্য থেকে রজবসহ চারটি মাসকে আল্লাহ তা’আলা ‘আশহুরে হুরুম’ তথা সম্মানিত মাস বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারটি, যা আল্লাহর কিতাব (অর্থাৎ লাওহে মাহফুজ) অনুযায়ী সেই দিন থেকে চালু আছে, যেদিন আল্লাহ আকাশমন্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন। এর মধ্যে চারটি মাস মর্যাদাপূর্ণ৷ এটাই দ্বীনের সহজ-সরল দাবী৷ সুতরাং তোমরা এমা সমূহের ব্যাপারে নিজেদের প্রতি জুলুম করো না৷ সূরা তওবা: ৩৬

ইমাম আবু বকর জাসসাস (রহ.) বলেন, ‘এসব মাসে ইবাদতের প্রতি যত্নবান হলে, বাকি মাসগুলোয় ইবাদত করা সহজ হয়। আর এ মাসগুলোতে গোনাহ থেকে বেঁচে থাকলে অন্য মাসেও গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়।’ -আহকামুল কুরআন: ৩/১৬৩

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মাসকে খুবই গুরুত্ব দিতেন। ফলে রজবের চাঁদ দেখা গেলেই তিনি কিছু বিশেষ আমল শুরু করতেন। হাদিস শরিফে এসেছে, হযরত আনাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত, যখন রজব মাস শুরু হতো, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন এ দুআটি বেশি বেশি পড়তেন, ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজাবা ওয়া শাবান, ওয়াবাল্লিগনা রমাদান।’ অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসকে বরকতময় করুন এবং আমাদেরকে রমজান মাস পর্যন্ত পৌঁছে দিন।’ –সুনানে নাসাঈ: হাদীস নং ৬৫৯

গোনাহের কারণে কলুষিত অন্তরাত্মাকে তওবার মাধ্যমে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে নিতে হবে রজব মাসে। হযরত আবু বকর বলখি (রহ.) বলেন, ‘রজব ফসল রোপণের মাস। শাবান ফসলে পানি সেচ দেওয়ার মাস। আর রমজান হলো- ফসল তোলার মাস।’ তিনি আরও বলেন, ‘রজব মাস ঠাণ্ডা বাতাসের মতো, শাবান মাস মেঘমালার মতো। আর রমজান মাস হলো- বৃষ্টির মতো।’ – লাতায়েফুল মাআরেফ: ১৪৩

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রজব মাস থেকেই রমযানের প্রস্তুতি নিতেন। অধিক নফল রোজা ও ইবাদতে কাটাতেন রজব ও শাবান মাস। তাই আমাদেরও কর্তব্য হল রাসূলের এসকল সুন্নাহগুলো অনুসরণ করে রজব মাসের হক আদায় করা এবং বেশি বেশি নফল নামায ও রোযা রাখা।

আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহতায়ালার বিধান মতে আল্লাহর নিকট মাসের সংখ্যা বার মাস সেই দিন হতে যেই দিন তিনি আকাশ মণ্ডল এবং পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত।

এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না।’ (সুরা আত তাওবাহ: ৩৬)                                                পবিত্র কোরআনে যে চারটি মাসকে সম্মানিত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে, রজব মাস তার একটি। আরবি সপ্তম মাস রজব। রজব শব্দের অর্থ সম্মানিত আর রজব হলো আল্লাহতায়ালার বিশেষ অনুগ্রহের মাস।

হাদিসে এসেছে, হযরত আবু বাকরা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, ১২ মাসে বছর। তার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত।

তিনটি মাস ধারাবাহিক আর তা হচ্ছে- যিলক্বদ, যিলহজ, মহররম আর চতুর্থ মাসটি হল-রজব, যা জুমাদাল উখরা ও শা’বান মাসের মধ্যবর্তী মাস (সহিহ বোখারি)।

অন্যান্য মাসের মতো রজব মাসের জন্য বিশেষ কিছু নফল আমল রয়েছে, যা আমল করলে আমরা জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি লাভ করতে পারি এবং জান্নাত লাভের পথ সুগম হবে।

হাদিস পাঠে জানা যায়, যখন রজব মাস শুরু হত, তখন মহানবী (সা.) দুই হাত তুলে এ দোয়া পাঠ করতেন এবং সাহাবাদের পড়তে বলতেন, ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজবাও ওয়া শাবানা ওয়া বাল্লিগনা ইলা শাহরির রমাদান’ (মসনদে আহমদ)।

অর্থাৎ হে আল্লাহ! তুমি আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসে বরকত দাও এবং আমাদেরকে রমজান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দাও।

তাই বলা যায় মোমিন মুত্তাকিরা সম্মানিত রজব মাস থেকেই পবিত্র মাহে রমজানের প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

তারা রজব মাসেই একটি রুটিন তৈরী করে যে, পূর্বের রমজান থেকে আগত রমজানে কি কি নেক আমল বেশী করবে।

গত রমজানে যদি একবার পবিত্র কোরআন খতম দিয়ে থাকে তাহলে এবার ইচ্ছা রাখে দু’বার দেয়ার। অর্থাৎ সব কিছুতেই মোমেন চায় পূর্বের তুলনায় বেশী ইবাদত বন্দেগীতে রত থাকতে।

তাই একজন মোমেন রমজান আসার পূর্বে রজব মাস থেকেই নিজকে রমজানের জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত করে তোলে।

বাহ্যিকভাবে আমরা যেমন স্কুল-কলেজের পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করার জন্য অনেক পূর্ব থেকেই নিজেকে গড়ে তুলি আর সব সময় মাথায় পরীক্ষায় ভাল ফলাফলের চিন্তা ঘুরপাক করে ঠিক তেমনি যারা মোমেন তারা রমজানকে শ্বাগত জানানোর জন্য রজব মাস থেকেই তৈরী হয়ে থাকে।

আসলে সম্মানিত রজব মাস আমাদেরকে রমজানের ইবাদতের জন্য প্রস্তুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমি রাসুলেকে (সা.) রজব ও শাবান মাসে এত বেশি রোজা রাখতে দেখেছি, রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসে এত রোজা রাখতে দেখিনি।

স্রষ্টার পরে মাখলুকের মধ্যে রাসুলেপাক (সা.) এর প্রথম স্থান হওয়ার পরেও তিনি রমজানের প্রস্তুতি হিসেবে রজব মাস থেকে রোজা রাখা শুরু করতেন।

তাই আমরাও যদি এই রজব মাস থেকে পবিত্র মাহে রমজানের প্রস্তুতি নিতে থাকি আর আল্লাহর কাছে দোয়া করতে শুরু করি যে, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে সুস্থ্য রাখ আমি যেন আগত রমজানে পূর্বের তুলনায় অনেক বেশী ইবাদত-বন্দেগী, দানখয়রাত, কোরআন পাঠসহ সব পুণ্য কর্ম বেশী বেশী করতে পারি।

এছাড়া হজরত রাসুল করিম (সা.) শাবান মাসেও অনেক বেশি ইবাদত করতেন আর তিনি (সা.) রমজান ছাড়াও প্রতি মাসে নফল রোজা রাখতেন আর বিশেষ করে রজব মাসে।

আমরাও যদি মহানবী (সা.)-এর সুন্নত অনুযায়ি প্রতি মাসে কয়েকটি করে নফল রোজা রাখি তাহলে রমজানের রোজা আমাদের জন্য আরো সহজ হবে।

এছাড়া আমরা যদি মনের সব দূর্বলতা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে রজব মাস থেকেই রমজানের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুতি গ্রহণ করি তাহলে আমাদের সব ইবাদত বন্দেগী হবে প্রশান্তিময়।

তাই আসুন, পবিত্র মাহে রমজানকে স্বাগত জানাতে এই রজব মাস থেকেই নিজেকে পরিপূর্ণভাবে প্রস্তুত করে নেই।

আল্লাহতায়ালা আমাদের সকলকে সম্মানিত রজব মাসের তাৎপর্য বুঝার এবং এর ওপর আমল করার তৌফিক দান করুন।

সেই সাথে দয়াময় আল্লাহর দরবারে আমরা সকাতর প্রার্থনা করি, হে আল্লাহ!

আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করে আপনার দয়ার চাদরে আমাদেরকে আবৃত করে নিন আর রমজানের আগেই বিশ্বকে করুন করোনা মুক্ত, আমিন।

লিখক: শিক্ষক,দারুল ইরফান মুহিউচ্ছুন্নাহ,উনছিপ্রাং,হোয়াইক্যং, টেকনাফ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Developed By Banglawebs